যশোরের বুকে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় ইংরেজ কবরস্থান

ডি এইচ দিলসান:যশোর শহরের কারবালা পুকুরপাড় এলাকার বিপরীত পাশে অবস্থিত প্রায় আড়াই শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহাসিক খ্রিস্টান কবরস্থান আজ নীরবে হারিয়ে যাওয়ার পথে। একসময় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই কবরস্থান বর্তমানে অবহেলা, অযত্ন এবং সময়ের নির্মম ক্ষয়ের শিকার।

বিশেষ অনুমতি নিয়ে সম্প্রতি আমরা কবরস্থানটি পরিদর্শন করি একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে। আমার সঙ্গে ছিলেন বন্ধু পায়েল, পেশায় একজন মেজর। দায়িত্বপূর্ণ কর্মজীবনের পাশাপাশি ইতিহাস ও আলোকচিত্রের প্রতি তার গভীর আগ্রহ রয়েছে। আর একজন সাংবাদিক হিসেবে ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায় খুঁজে বের করাই আমার পেশা ও নেশা।

১৭৮১ সালে যশোর ব্রিটিশ ভারতের একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানে ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও খ্রিস্টান মিশনারিদের আগমন ঘটে। তাদের বসবাসের পাশাপাশি গড়ে ওঠে গির্জা এবং এই খ্রিস্টান কবরস্থান। দীর্ঘদিন ধরে এটি যশোরের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কবরস্থানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ভাঙাচোরা সমাধি, শ্যাওলায় ঢাকা সমাধিফলক এবং সময়ের ক্ষয়ে প্রায় মুছে যাওয়া অসংখ্য নাম। কোথাও ইট খুলে নেওয়া হয়েছে, কোথাও পুরো সমাধিই মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। অনেক সমাধির পরিচয় এখন আর স্পষ্ট নয়। চারপাশের নীরবতা যেন ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কবরস্থানটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। বর্তমানে চার্চ অব বাংলাদেশ কবরস্থানটির দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে একের পর এক ঐতিহাসিক সমাধি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উত্তরপুরুষ না থাকায় অনেক কবরের খোঁজখবর নেওয়ারও কেউ নেই।

ঐতিহাসিকদের মতে, এই কবরস্থান শুধু একটি ধর্মীয় সমাধিক্ষেত্র নয়; এটি যশোরের ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ইতিহাসের একটি অমূল্য দলিল। এখানে সমাহিত আছেন যশোরের প্রথম জেলা কালেক্টর টিলম্যান হেংকেল, সর্বশেষ ইংরেজ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ. এস. লারকিন, প্রথম জেলা ও দায়রা জজ পার এবং সর্বশেষ ইংরেজ জেলা ও দায়রা জজ কে. পি. পিপলাই। তাঁদের সমাধি যশোরের প্রশাসনিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে বিবেচিত।

ইতিহাস গবেষকদের ভাষ্য, এসব সমাধি শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন নয়; এগুলো ব্রিটিশ শাসনামলে যশোরের প্রশাসনিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা এবং নগর বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা মানে শহরের ইতিহাস সংরক্ষণ করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ নেওয়া না হলে যশোরের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের অনেকটাই চিরতরে হারিয়ে যাবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, চার্চ অব বাংলাদেশ এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কবরস্থানটি সংরক্ষণ, তথ্যফলক স্থাপন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো সমাজের। যশোরের কারবালার এই ঐতিহাসিক খ্রিস্টান কবরস্থান সংরক্ষিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু একটি কবরস্থানই দেখবে না, বরং জানবে তাদের শহরের প্রায় আড়াই শতাব্দীর ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা।

About Magpie News