নদীর বালুই হবে বাংলাদেশের ‘সাদা সোনা’

নিজস্ব প্রতিবেদক : বর্তমান বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো সেমিকন্ডাক্টর চিপ। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফাইভজি যোগাযোগ এবং বৈদ্যুতিক যানের মতো ভবিষ্যতের প্রযুক্তির মূল ভিত্তি।
বৈশ্বিক এ চিপ যুদ্ধের আবহে বাংলাদেশের জন্য এক অভাবনীয় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে নদীজ বালু। হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা এবং তিস্তা নদীর অববাহিকায় জমা হওয়া বিপুল পরিমাণ কোয়ার্টজ সমৃদ্ধ বালু বাংলাদেশের জন্য একটি ‘কৌশলগত সম্পদে’ পরিণত হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সোহেল রানা একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরেন।

যেখানে প্রতিবছর হিমালয় থেকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টন পলি ও বালু নেমে আসে। এ বালু কেবল নদী ভরাট বা নির্মাণকাজের উপাদান নয়, এতে রয়েছে উচ্চমানের কোয়ার্টজ এবং ইলমেনাইট, জিরকন ও রুটাইলের মতো মূল্যবান খনিজ পদার্থ। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ৯০ শতাংশই সিলিকন-ভিত্তিক। আর এ সিলিকন তৈরির প্রাথমিক কাঁচামাল হলো হাই-পিউরিটি কোয়ার্টজ।
আরও পড়ুন: ২০৫০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর হাব হবে বাংলাদেশ

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর বালু কোয়ার্টজ সমৃদ্ধ। সাম্প্রতিক খনিজ প্রক্রিয়াকরণ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, রিভার্স ফ্লোটেশন পদ্ধতিতে এ বালু থেকে ৯৯.৫ শতাংশ বিশুদ্ধ সিলিকা উৎপাদন করা সম্ভব। এটি উন্নত মানের কাঁচ শিল্পের উপযোগী।

সেমিকন্ডাক্টর গ্রেডের সিলিকন ওয়েফার তৈরির জন্য অবিশ্বাস্য রকমের বিশুদ্ধতা প্রয়োজন। এটি ৯৯.৯৯ শতাংশ বা ‘৯এন’ নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের বালু কাঁচ শিল্পের মানদণ্ড পূরণ করলেও এটি চিপ তৈরির আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারবে কি না সেটি এখনো গবেষণার বিষয়।

গবেষণাপত্রটি সতর্ক করে দিয়ে জানায়, বর্তমানে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব রয়েছে যা নিশ্চিত করতে পারে যে বাংলাদেশের এ সম্পদ চিপ তৈরির কঠোর বিশুদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা মেটায়। চিপ তৈরির জন্য অতি-সামান্য অপদ্রব্য (যেমন লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম) এবং ক্রিস্টাল ডিফেক্ট থাকা চলবে না। তাই এ বালুকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আল্ট্রা-ট্রেস অপদ্রব্য বিশ্লেষণ এবং পাইলট-স্কেল রিফাইনিং প্রযুক্তির প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

ড. সোহেল রানা বলেন, ‘ আমাদের মনে রাখতে হবে, কাঁচ শিল্পের সিলিকা আর সেমিকন্ডাক্টর গ্রেডের কোয়ার্টজের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সরাসরি চিপ তৈরির কারখানা (ফ্যাব) স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আমার সুপারিশ হলো, বাংলাদেশকে একটি ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশল নিতে হবে। প্রথমে হাই-পিউরিটি সিলিকা উৎপাদন এবং আইসি ডিজাইনে গুরুত্ব দিতে হবে।’

ড. রানার মতে, ‘সরকার যদি একটি বিশেষায়িত ‘স্যান্ড প্রসেসিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করে এবং আমাদের মেধাবী প্রকৌশলীদের এ খাতে দক্ষ করে তোলে তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর বাজারে উপকরণ সরবরাহকারী হিসেবে নেতৃত্ব দিতে পারবে।’

গবেষণায় ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত একটি জাতীয় রোডম্যাপ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর প্রথম ধাপে রয়েছে নদীজ বালুর বিশুদ্ধতা নিয়ে নিবিড় অনুসন্ধান এবং গবেষণা অবকাঠামো তৈরি। বাংলাদেশ বর্তমানে বিপুল সংখ্যক প্রকৌশলী জনবল এবং প্রতিযোগিতামূলক শ্রম ব্যয়ের সুবিধার অধিকারী। এটি এ শিল্পের জন্য সহায়ক।

About Magpie News

Check Also

বোমা আতঙ্কের মধ্যেও শেষ দিনে লালন আখড়াবাড়িতে মানুষের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক : কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ থেকে টাইম বোমাসদৃশ বস্তু …