ফিদেল কাস্ত্রোর শততম জন্মদিনে যশোরে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

যশোর প্রতিনিধি: মহান কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও কিউবার বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর শততম জন্মদিন উপলক্ষে যশোরে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেলে যশোরের বিবর্তন মঞ্চে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদ, যশোর জেলা শাখার উদ্যোগে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন হারুন অর রশিদ। সভা সঞ্চালনা করেন মুস্তাফিজুর রহমান কবির।
সভায় ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবন, কিউবার বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেন মফিজুর রহমান রুননু, অধ্যাপক ইসরারুল হক, আহসান উল্লাহ ময়না, শামীম বিশ্বাস ও লেখক কাইয়ুম শিকদার।
বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে নয়; বরং কিউবার স্বৈরশাসন, বৈষম্য, বিদেশি আধিপত্য ও জনগণের ওপর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক বিকাশ ঘটে। ১৯৫৩ সালের মনকাডা ব্যারাক আক্রমণ, কারাবরণ, মেক্সিকোতে নির্বাসন, ১৯৫৬ সালে গ্রানমা নৌযানে করে কিউবায় প্রত্যাবর্তন এবং সিয়েরা মায়েস্ত্রায় গেরিলা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি বিপ্লবী আন্দোলনের নেতৃত্বে উঠে আসেন।
আলোচনায় বক্তারা ফিদেল কাস্ত্রোর বিখ্যাত আত্মজিজ্ঞাসামূলক বক্তব্য ‘কীভাবে আমি কমিউনিস্ট হলাম’-এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, ফিদেলের নিজের ভাষায়— “জীবনই আমাকে তৈরি করেছে আরও বিপ্লবী, আরও সমাজতান্ত্রিক, আরও কমিউনিস্ট।” কিউবার বাস্তব রাজনৈতিক সংকট, শোষণ-বৈষম্যের অভিজ্ঞতা এবং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য প্রত্যক্ষ করার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে।
বক্তারা আরও বলেন, ১৯৫৯ সালের কিউবা বিপ্লবের বিজয়ের পর ভূমি সংস্কার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জাতীয়করণ ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কিউবা নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ ও সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফিদেল কাস্ত্রো দৃঢ় অবস্থান নেন।
আলোচনায় ফিদেল কাস্ত্রোর মার্কসবাদ-লেনিনবাদে অঙ্গীকারের বিষয়টিও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, বিপ্লবী সংগ্রামের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ফিদেলের নেতৃত্বাধীন কিউবার বিপ্লব ক্রমে সমাজতান্ত্রিক চরিত্র গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক ধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো শুধু কিউবার একজন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লব লাতিন আমেরিকাসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বহু মুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে।
তবে বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর বিপ্লবী ভূমিকার পাশাপাশি কিউবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা, বিরোধী মত, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেগুলোকেও ইতিহাসের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ইতিহাসের সামগ্রিক বাস্তবতার মধ্যেই ফিদেলের রাজনৈতিক অবদান ও সীমাবদ্ধতা বিচার করতে হবে।
সভায় বক্তারা বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর জীবন থেকে সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, বৈষম্য ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শিক্ষা নেওয়া যায়। একটি ছোট দ্বীপদেশের জনগণ কীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বৃহৎ শক্তির চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, কিউবার বিপ্লব তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।
আলোচনা সভা থেকে বক্তারা বিশ্বের নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।
সভায় ফিদেল কাস্ত্রোর শততম জন্মদিনে তাঁর বিপ্লবী স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়— “ফিদেল গতকালের, ফিদেল আজকের, ফিদেল চিরদিনের। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে ফিদেল কাস্ত্রো একটি দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী স্মৃতি।”

About Magpie News

Check Also

সাতক্ষীরা কল্যাণ সমিতির ‘গল্পের আসর ও খিচুড়ি পার্টি’

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘গল্প করি, খিচুড়ি খাই, মিলে মিশে থাকি সবাই’—এই স্লোগানে যশোরস্থ সাতক্ষীরা কল্যাণ …