ভবদাহ : ৩০ বছরের জলাবদ্ধতার অভিশাপ প্রকল্পের পর প্রকল্প, তবু মিলেনি স্থায়ী সমাধান

হাজার কোটি টাকার উদ্যোগ

দশ লাখো মানুষের দুর্ভোগ

আর প্রশ্নের মুখে পানি ব্যবস্থাপনা

বিশেষ অনুসন্ধান । ডি এইচ দিলসান :

যশোর ও খুলনার সীমান্তবর্তী ভবদাহ অঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষা মানেই আতঙ্ক। একসময় নদীভিত্তিক উর্বর জনপদ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল আজ দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার প্রতীক। অভয়নগর, কেশবপুর, মনিরামপুর, যশোর সদর এবং খুলনার ডুমুরিয়া-ফুলতলার বিস্তীর্ণ এলাকা ১০ লক্ষ মানুষ কয়েক দশক ধরে একই সমস্যার মুখোমুখি।
সরকার বিভিন্ন সময়ে নদী পুনঃখনন,স্ল-ুইসগেট নির্মাণ, টিআরএম, বাঁধ সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৮১.৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের একটি বড় প্রকল্পও বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু রয়ে গেছে এত উদ্যোগের পরও কেন স্থায়ী সমাধান মিলছে না?
পানি সম্পদ পরিকল্পনা, নদী প্রকৌশল, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নদীর মর্ফোলজি বিষয়ে অভিজ্ঞ সিনিয়র ওয়াটার রিসোর্স স্পেশালিস্ট ড. ফারুক আহমেদ মোহিউদ্দিন বলেন ভবদাহের সংকটের মূল কারণগুলো হলো কপোতাক্ষ, হরি, হরিহর, শ্রী, তেলিগাতী ও অন্যান্য নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, নদী ও খালে অতিরিক্ত পলি জমা, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ ও মাছের ঘের, খাল দখল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। ফলে বর্ষার পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারে না, দীর্ঘ সময় ধরে জমে থেকে বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

৩০ বছরে কত টাকা ব্যয় হয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে জানা গেছে ১৯৯৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ভবদাহ-সংক্রান্ত সব প্রকল্পের সমন্বিত সরকারি ব্যয়ের একক হিসাব পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন সময়ে নদী পুনঃখনন, টিআরএম, স্লু-ইসগেট সংস্কার ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্পে কয়েকশ থেকে হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সরকারি নথি ও সংবাদসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে চলমান বড় প্রকল্পগুলোর তথ্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প ডাটাবেজে পাওয়া যায়।
বর্তমানের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ২০২৫ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮১.৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন আনুমানিক ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত হরি, হরিহর, শ্রী, টেকা ও তেলিগাতী নদীর বিভিন্ন অংশে কাজ প্রায় ৫৫ শতাংশ শেষ হয়েছে এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নদী খনন হলেও কেন মিলছে না সুফল? এ কারন জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নদী খনন হয়, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে আবার পলি জমে যায়। এককালীন ড্রেজিং যথেষ্ট নয়। পুরো নদী অববাহিকাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না হলে পুনরায় একই সমস্যা দেখা দেয়।
ভবদাহের ২১-ভেন্ট স্লু-ইসগেট বহু বছর ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের অভিযোগ, গেটের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং নদীতে পলি জমার কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্থ হয়।
সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, ভবদাহ অঞ্চলে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার প্রভাবে ভুগছেন। প্রভাবিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে, কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর, যশোর সদর (আংশিক) খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতলা। এই অঞ্চলের কৃষির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানে এই জলাবদ্ধতা। আমন ধান নষ্ট হয়, সবজি চাষ ব্যাহত হয়, পাট উৎপাদন কমে যায়, মাছের ঘেরও অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ৭৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতার প্রভাবে শত কোটি টাকার র ক্ষতি হয় বতে হয় বলে স্থানীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে বর্ষাকালে বহু শিক্ষার্থী নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যায়। অনেক এলাকায় স্কুলে উপস্থিতি কমে যায়।
দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ফলে দেখা দেয় ডায়রিয়া ও চর্মরোগ। বিশুদ্ধ পানির সংকট, সাপের উপদ্রবও বাড়ে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু সংযোগ খাল দখল, ভরাট বা মাছের ঘেরে রূপান্তরিত হওয়ায় পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে।
ইতমধ্যে যশোরের ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং কার্যকর টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-টিআরএম) বাস্তবায়নের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কালেক্টরেট চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।
গত সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে মণিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলার জলাবদ্ধতাকবলিত এলাকার শতাধিক মানুষ অংশ নেন।
কর্মসূচির আগে লাঙল, কাস্তে, শাপলা ও জলাবদ্ধতার প্রতীকী বিভিন্ন উপকরণ হাতে নিয়ে মিছিলসহকারে কালেক্টরেট চত্বরে জড়ো হন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেও তারা অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন।
ভবদাহ পানি সংগ্রাম কমিটির নেতারা বলছেন, ভবদাহ সমস্যার মূল কারণ শুধু নদী ভরাট নয়; দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা, সময়মতো নদী ও খাল পুনঃখনন না করা, এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়াও এই সংকটকে জটিল করেছে। তাদের দাবি, গত তিন দশকে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
নেতারা আরও বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত পুরো নদী অববাহিকাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভবদাহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাদের মতে,প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় কৃষক, জেলে, পানি বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিদের মতামত বাধ্যতামূলকভাবে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি খাল দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত নদী খনন, কার্যকর স্লুইসগেট পরিচালনা এবং টিআরএম বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।পানি সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, ভবদাহ অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা, কৃষকদের ক্ষতিপূরণ এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘যে নদী কাটা হয়েছিল সেটা ভরাট হয়ে গেছে এবং যে বাঁধ দেয়া হয়েছিল বাঁধও পরিপূর্ণভাবে অপসারণ করা হয়নি। ফলে এখন এই যে উদ্ভূত পরিস্থিতি, এজন্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বহীনতা প্রধানত দায়ী।’
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, ‘খুব বেশি পরিমাণে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে গেট দিয়ে। সেনাবাহিনীও তাদের জায়গা থেকে ড্রেজিং কাজ বাস্তবায়ন করছে। আশা করছি যে অচিরেই খুব স্বল্প সময়ের ভেতরে যেটুকু পানি ভবদহের ভেতরে লোকালয়ে এলাকায় থেকে গেছে, এ পানিটা খুবই নিষ্কাশিত হয়ে যাবে।’

About Magpie News

Check Also

বোমা আতঙ্কের মধ্যেও শেষ দিনে লালন আখড়াবাড়িতে মানুষের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক : কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ থেকে টাইম বোমাসদৃশ বস্তু …