নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮৯, নিখোঁজ ৬৬৭


অনলাইন ডেস্ক : নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টা আগেও মৃতের সংখ্যা ৩৫৯ বলে জানানো হয়েছিল।

তবে পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে হতাহতের খবর আসায় মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেড়েছে।
এদিকে নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, এ দুর্যোগের পর এখন পর্যন্ত ৬৬৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫৪০ জনই বিদেশি নাগরিক এবং ১২৭ জন নেপালি।

নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭৮ জন ভারতের নাগরিক।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ জন, ইউক্রেনের ৫৩ জন, মালয়েশিয়ার ৫১ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৫ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ বিদেশিরা বিশ্বের ৩১টি দেশের নাগরিক বলে জানিয়েছে নেপাল পর্যটন বোর্ড।
তবে দুর্গত এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ৩১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইতালি, বুলগেরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিক রয়েছেন।

এর আগে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বন্যার পর ৯১০ জন নিখোঁজ ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। ফলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্যের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। পৃথক সংস্থাগুলো আলাদা সময়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য দেওয়ায় নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে।

নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী—দেশটিতে আহত ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৬ জনে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রাসুয়া জেলায়, যেখানে বন্যা ও ভূমিধসের প্রাথমিক আঘাত সবচেয়ে তীব্র ছিল।

সেখানে আহত ও উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা ২৮৯ জন।
এ ছাড়া নুয়াকোট জেলায় ৯০ জন, ধাডিং জেলায় তিনজন এবং রাজধানী কাঠমান্ডু এলাকায় ৮৪ জন আহত বা উদ্ধার হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগে নেপালের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, শুধু বৃহস্পতিবারই অন্তত ৫৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যানের সঙ্গে এ সংখ্যারও পার্থক্য রয়েছে।

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকারী দলগুলো তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।

৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধেয়ে আসছে আরো ভয়ংকর বিপর্যয়?

নেপালে আকস্মিক বন্যায় অকল্পনীয় বিপর্যয়ের মধ্যেই আরো বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা সামনে আসছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন-সিসিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় বর্তমান বিপর্যয় এলাকার কাছেই নতুন সৃষ্ট একটি কৃত্রিম হ্রদ থেকে নতুন ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে বেইজিং কর্তৃপক্ষ।

সিসিটিভির তথ্যমতে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে দুর্যোগস্থলের উত্তর-পূর্বে ছচেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর সংযোগস্থলে নতুনভাবে সৃষ্ট এই হ্রদটির ওপর নজরদারি ও মূল্যায়ন জোরদার করেছে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। উদ্ধারকাজে সহায়তা এবং পরবর্তী অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সিসিটিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই কৃত্রিম হ্রদটিতে পানির পরিমাণ আনুমানিক ২০ লাখ কিউবিক মিটার ছিল এবং এটি ইতিমধ্যে উপচে পড়ছে। টানা বৃষ্টির কারণে আগামী ৭২ ঘণ্টায় হ্রদটিতে আরো ৩০ লাখ কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিসিটিভি এবং গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতিরিক্ত পানির এই বিশাল চাপের কারণে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হ্রদের প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে। যদি এই হ্রদের বাঁধটি সত্যিই ভেঙে যায়, তবে সেটি এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় একটি বিধ্বংসী মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাঁধ ভাঙা মাত্রই লাখ লাখ কিউবিক মিটার পানি ও কাদার প্রাচীর তীব্র গতিতে ভাটির দিকে ধেয়ে যাবে। প্রথম বন্যার ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই এটি নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোকে নতুন করে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তেমনটি হলে উদ্ধারকাজ স্থবির হয়ে যাবে। উদ্ধারকর্মীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে যোগাযোগ ব্যবস্থা। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই হ্রদটি ভেঙে পড়লে সেই পানি সরাসরি নেপালের ভটে কোসি এবং ত্রিশূলী নদী হয়ে ভাটির দিকে যাবে। তাতে নেপালে মৃত্যুর মিছিল আরো দীর্ঘ হবে।

এই হ্রদটি আগে ছিল না। ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় একে ‘ল্যান্ড স্লাইড ড্যাম’ বলা হয়। গত বুধবারে হিমালয় সীমান্তে যে বিশাল বরফ-পাথর ও কাদামাটির ধস নেমেছে, তার একটি বড় অংশ ছচেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর সংযোগস্থলে এসে পড়ে। এই ধসের কারণে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথটি পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে যায়। পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটি এবং পাথরের স্তূপ নদীর ওপর একটি অস্থায়ী ‘প্রাকৃতিক বাঁধ’ বা দেয়াল তৈরি করেছে। এই দেয়ালের পেছনে নদীর পানি আটকে গিয়েই এই নতুন কৃত্রিম হ্রদটির সৃষ্টি হয়েছে।

হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর মাত্র দুদিনেই সেখানে প্রায় ২০ লাখ কিউবিক মিটার নতুন পানি জমা হয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢল এবং বৃষ্টির কারণে সেখানে প্রতি মুহূর্তে আরো পানি এসে যোগ হচ্ছে, যার ফলে এটি ইতিমধ্যে উপচে পড়ছে। টানা বৃষ্টিতে আগামী ৭২ ঘণ্টায় সেখানে আরো ৩০ লাখ কিউবিক মিটার জমা হলে নতুন করে ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটতে পারে।

আবহাওয়া ও ‍দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই হ্রদটিকে ‘টাইম বোমা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এই কারণেই চীন সরকার সেখানে স্যাটেলাইট ও ড্রোন দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করছে। এই নতুন কৃত্রিম হ্রদটি ঠিক তিব্বত এবং নেপাল সীমান্তের হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত। এটি মূলত নেপাল অংশে তৈরি হয়েছে, তবে এর প্রভাব সরাসরি তিব্বত ও নেপাল উভয়ের সীমান্ত এলাকা জুড়েই রয়েছে।

About Magpie News

Check Also

বোমা আতঙ্কের মধ্যেও শেষ দিনে লালন আখড়াবাড়িতে মানুষের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক : কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ থেকে টাইম বোমাসদৃশ বস্তু …