এক দশকে বদলে গেছে জলাশয়ের চিত্র, হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ, সংকটে জেলেদের জীবন
ডি এইচ দিলসান : একসময় বর্ষা এলেই যশোরের বিল, খাল, বাওড় ও নিচু জমিগুলো পানিতে ভরে উঠত। পানির সঙ্গে আসত বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, টাকি, কৈ, শিং, মাগুর, টেংরা, পাবদা, গুলশা, পুঁটি, মলা, ঢেলা, চান্দা রুই, কাতলা, মৃগেল, খলিশাসহ নানা জাতের দেশি মাছ। গ্রামের মানুষ জাল, চাই, ঘুনি, বড়শি কিংবা হাতজাল নিয়ে নেমে পড়তেন বিলে। অনেক পরিবারের আমিষের বড় উৎস ছিল এসব মুক্ত জলাশয়ের মাছ। জেলেদের অনেকের জীবিকাও নির্ভর করত বিল-বাঁওড়ের ওপর। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
জেলার বিভন্ন উপজেলার জেলে, কৃষক ও সাধারন মানুষের কাজে গিয়ে এবং মৎস্য কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে বর্তমানে স্থনীয়ভাবে প্রায় ৩০ প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্তির পথে থাকার কথা উঠে এসেছিল। পুঁটি, মায়া, খয়রা, সরপুঁটি, ডানকুনো, পাবদা, লালচান্দা, খলিশা, টাকি, শিং, মাগুর, ভেদা, টেংরা, কাকিলা, কই, বেলে, শৈল, গজার, বোয়াল ও বাইনসহ বিভিন্ন মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার কথা জানান স্থানীয়রা।
যশোর জেলা মৎস্য অফিসের ২০২২-২৩ সালের পরিসংখ্যান বলছে, জেলায় বিলের আয়তন ২ হাজার ৭১৯ হেক্টর। এর পাশাপাশি ৩৯ হাজার ৬৭১ হেক্টর প্লাবনভূমি, ১২ হাজার ৪২০ হেক্টর মৌসুমি জলাশয়, ১ হাজার ৫০০ হেক্টর বাওড় এবং ১ হাজার ৭৮৬.৬৩ হেক্টর নদী রয়েছে।
ওই অর্থবছরে বিল থেকে মাছের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৮০১ মেট্রিক টন এবং প্লাবনভূমি থেকে ৩৬ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। জেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৭ হাজার ৫৬১ জন এবং মোট মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৪১ হাজার ৭৭৩ জন।
অর্থাৎ যশোরে এখনও বিশাল উন্মুক্ত জলাভূমি রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই জলাভূমিগুলো আগের মতো দেশি মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হিসেবে কতটা কার্যকর আছে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে দেখা গেছে
যশোরের আট উপজেলার বিল, খাল, বাওড় ও উন্মুক্ত জলাশয়ের বড় একটি অংশ গত এক দশকে বাণিজ্যিক মাছ চাষের আওতায় চলে এসেছে। এমন অভিযোগ স্থানীয় জেলে, কৃষক ও পরিবেশকর্মীদের। বিশেষ করে বিভিন্ন জলাশয় ঘিরে বাঁধ দিয়ে ঘের তৈরি করে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ কার্পজাতীয় মাছের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ায় উন্মুক্ত জলাশয়ের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ, মাছের চলাচল প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
মনিরামপুরের জেলে ববতোষ পাড়ে বলেন, “আগে বর্ষা এলে বিলের পানি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচল করত। মাছও এক বিল থেকে আরেক বিলে যেত। এখন অনেক জায়গায় বাঁধ দিয়ে ঘের করা হয়েছে। ফলে মাছের চলাচলের পথ কমে গেছে।”
কেশবপুরের জেলে ওরিয়ার রহমান বলেন,“আগে খাল-বিল থেকে শোল, টাকি, কৈ, শিং, মাগুর, টেংরা, পাবদা, পুঁটি—অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন ঘেরের কারণে অনেক জায়গায় উন্মুক্তভাবে মাছ ধরার সুযোগ নেই। ফলে জেলেদের আয়ও কমেছে।” কেশবপুরে সরকারি খাল দখল করে মাছের ঘের তৈরির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে উপজেলার ৪ হাজার ৬৫৮টি মাছের ঘেরের মধ্যে ৫৯টি সরকারি খাল দখল করে মাছ চাষের অভিযোগ উঠে আসে। এর আগে কেশবপুরে শ্যারের খাল দখল করে মাছ চাষের কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ ও খাল পানিশূন্য হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ভবদহ ও কপোতাক্ষ অঞ্চলেও বিল ও খাল দখল করে মাছের ঘের তৈরির কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে স্থানীয় সংগঠনগুলো অবৈধ ঘের অপসারণের দাবি জানায় ভবদাহ পানি নিস্কাসন সংগ্রাম কমিটি।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যশোর পৌর এলাকায় বর্তমানে পৌরসভা, জেলা প্রশাসন ও ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলিয়ে ৩২০টি জলাশয় রয়েছে। এক দশক আগেও জলাশয়ের সংখ্যা আরও বেশি ছিল এবং শহর ও শহরতলীতে একশর বেশি পুকুর-দীঘি ভরাট হয়ে গেছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, জলাশয় ভরাটের পাশাপাশি আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনেক জায়গায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
যশোরে বাণিজ্যিক মাছ চাষের ব্যাপকতা সরকারি পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট মাছ উৎপাদনে রুইজাতীয় মাছের অংশ সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে কার্পজাতীয় মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য জেলার ৪৬টি মৎস্য হ্যাচারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক মাছ চাষ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন —উন্মুক্ত জলাশয় যদি ক্রমেই ঘেরে পরিণত হয়, তাহলে দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র থাকবে কোথায়?
ভবদাহ পানি নিস্কাসন সংগ্রাম কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হামিদ বলেন “দেশীয় মাছ ফিরিয়ে আনতে হলে কিছু জলাশয়কে উন্মুক্ত রাখতে হবে। মাছের চলাচলের পথ, প্রজননক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম রক্ষা করতে হবে। ঘের তৈরির সময় পানি নিষ্কাশন ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার জন্য শুধু ঘেরকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না তিনি। নদী-খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট, পানিদূষণ, কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার, অতিরিক্ত মাছ আহরণ, ছোট ফাঁসের জাল এবং প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ধরাও এর সঙ্গে জড়িত। যশোর কৃষিপ্রধান জেলা। ফলে কৃষিজমিতে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশকের একটি অংশ বৃষ্টির পানির সঙ্গে খাল-বিল ও নিচু জলাশয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চৌগাছার দেশি মাছ কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্যেও অপরিমিত কীটনাশক ব্যবহারে পানি দূষণ, নদী-খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট এবং মা মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার মতো কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল।
স্থানীয় কৃষক বিপুল সরকার বলেন, “কৃষিতে কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু খাল-বিলে পানি থাকলে সেই পানি কোথায় যায়, মাছের ওপর কী প্রভাব পড়ে এসব নিয়ে আমাদের খুব বেশি ধারণা নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, যশোরের প্রতিটি উপজেলার বিল, খাল, বাওড় ও উন্মুক্ত জলাশয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটি জলাশয়ভিত্তিক ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি। কোন জলাশয় উন্মুক্ত, কোনটি ঘের হয়েছে, কোন খাল দখল হয়েছে, কোন বিলের সঙ্গে নদীর সংযোগ রয়েছে এবং কোথায় দেশীয় মাছের প্রজনন হয় এসব তথ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। এর পাশাপাশি— গুরুত্বপূর্ণ বিল ও জলাশয়কে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা, মাছের চলাচলের খাল ও সংযোগপথ উন্মুক্ত রাখা, সরকারি খাল দখল করে তৈরি ঘের উচ্ছেদ, ঘের তৈরির ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ, কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর ছোট ফাঁসের জাল নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক ব্যবহারে সচেতনতা, স্থানীয় জেলেদের নিয়ে জলাশয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন বিলুপ্তপ্রায় বাটা, সরপুঁটি, ভাঙ্গনা, কালিবাউশ, গণিয়া, মহাশোল, পাবদা, গুলশা, শিং, মাগুর, গুজি ও আইড়সহ বিভিন্ন মাছের প্রজনন ও চাষ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হয়েছে। তিনি বলেন “দেশি মাছ সংরক্ষণের জন্য প্রথম কাজ হলো তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করা। শুধু পোনা ছাড়লেই দেশি মাছের স্থায়ী উৎপাদন বাড়বে না।”
তিনি আরও বলেন, “বিল-খাল ও নদীর সঙ্গে মাছের চলাচলের সংযোগ রাখতে হবে। প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ, ক্ষতিকর জাল নিয়ন্ত্রণ এবং অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি।”
www.magpienews24.com Bangla News, Letest News, Jessore News