বাঘারপাড়া ডিগ্রি কলেজে ১৬টি মেহগনি গাছের মোটা ডাল ছাঁটাই নিয়ে বিতর্ক, অনুমতি ছিল ছোট ডাল কাটার
ডি এইচ দিলসান : যশোরের বাঘারপাড়া ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসের মেহগনি গাছের মোটা ডাল কাটাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। গাছের ডাল কাটার ঘটনায় সমালোচনা ও অভিযোগ ওঠার পর এবার খেলার মাঠ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে গাছ কাটার পক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। রোববার (১ নভেম্বর) প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন মাঠ সংস্কারের যুক্তিতে গাছের ডাল কাটার পক্ষে বক্তব্য দেন।
এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) কলেজ ক্যাম্পাসে গাছের ডাল ছাঁটাইয়ের নামে বড় বড় মেহগনি গাছের মোটা ডাল কেটে ফেলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, কলেজের প্রায় ২৫টি মেহগনি গাছের মধ্যে ১৬টি গাছের বড় বড় ডাল কেটে কাঠের লগ তৈরি করা হয়েছে। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চারজন শ্রমিক এ কাজ করেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়।
কলেজ কর্তৃপক্ষের যুক্তি, গাছের ডালপালা খেলার মাঠের স্বাভাবিক ব্যবহার ও মাঠ সংস্কারের কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে মাঠ সংস্কার প্রয়োজন। সে বিবেচনয় গাছের ডাল কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোববার সকালে প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলনে অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন মূলত মাঠ সংস্কারের প্রয়োজনিয়তা তার বিষয়টিই সামনে আনেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, কলেজের খেলার মাঠে ফুটবল খেলা বিঘ্নিত হওয়ায় গত ৮ অক্টোবর গভর্নিং বডির সভায় ক্যাম্পাসের কয়েকটি গাছের ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিরিক্ত ডাল কাটার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ১৫ অক্টোবর বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়া হয়। ৩১ অক্টোবর গাছের ডাল কাটা হয়।
তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা নথিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ২৬ অক্টোবর ইউএনওর কাছে পাঠানো চিঠিতে ৮ অক্টোবরের গভর্নিং বডির সভার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, কলেজের পরিবেশ, নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির স্বার্থে ক্যাম্পাসের কয়েকটি গাছের ঝুঁকিপূর্ণ অতিরিক্ত ডাল কাটার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের আওতাধীন হওয়ায় গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত ইউএনওকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে দ্রুত ডাল কাটার কাজ সম্পন্ন করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, ২৬ অক্টোবরের চিঠিতে ডাল কাটার অনুমতি পাওয়ার কোনো তথ্য নেই। সেখানে শুধু সিদ্ধান্ত অবহিত করে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। অথচ অধ্যক্ষের দাবি, এর আগেই ১৫ অক্টোবর অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। তবে সংবাদ সম্মেলনে ওই অনুমতিপত্রের কোনো অনুলিপি সরবরাহ করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা ডাল কাটার অনুমতিপত্র, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথির বিষয়ে জানতে চান। তবে এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি অধ্যক্ষ। ফলে গাছের ডাল কাটার অনুমোদন ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
অধ্যক্ষ জানান, কাটা ডালপালা আগামী ৪ নভেম্বর গভর্নিং বডির সভায় উপস্থাপন করা হবে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। কলেজ মাঠে ফুটবলসহ অন্যান্য খেলার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগকে বাধাগ্রস্থ করতে একটি মহল কৃত্রিম জটিলতা তৈরি করছে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বন্ধে সচেতন সমাজের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যক্ষ আব্দুল মতিনসহ, শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক জয়নাল আবেদী, শিক্ষক প্রতিনিধি আশরাফ আলী ও খালেদা পারভীন।
এদিকে এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে অনুমতির পরিধি নিয়ে। বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ভূপালী সরকার জানিয়েছেন, কলেজের অধ্যক্ষ গাছের ডাল ছাঁটাইয়ের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আবেদনে ভবন ও খেলার মাঠের ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী ছোট ডাল ছাঁটাইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুমতির বাইরে বড় ডাল কাটা হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট নুরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ এর আগে জানিয়েছিলেন, ভবন ও খেলার মাঠের সমস্যার কারণে গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে ডাল ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শ্রমিকদের ডাল ছাঁটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ভুলক্রমে কয়েকটি বড় ডাল কেটে ফেলা হয়েছে। কাটা কাঠ বিধি অনুযায়ী বিক্রি করা হবে বলেও তিনি জানিয়ে ছিলেন।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠ সংস্কারের জন্য ঠিক কতটুকু জায়গা প্রয়োজন? গাছের বড় ডাল না কেটে বিকল্প কোনো প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল কি না? মাঠের নকশা, সংস্কার পরিকল্পনা কিংবা পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না? আর প্রশাসনের অনুমতি যদি শুধু ছোট ডাল ছাঁটাইয়ের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে বড় ডাল কাটার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো কীভাবে? এমন প্রশ্ন করেছেন বয়োজেষ্ঠ শিক্ষানুরাগী মুদ্দাচ্ছের রহমান।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ক্যাম্পাসের গাছপালাও শিক্ষার পরিবেশ, ছায় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই মাঠ সংস্কার এবং বৃক্ষ সংরক্ষণকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনার করা দরকার বলে মনে করেন সচেতন মহল।
এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের তদন্তের পাশাপাশি কাটা ডালের পরিমাণ, কাঠের বর্তমান অবস্থান, বিক্রির প্রক্রিয়া এবং অনুমতির শর্ত অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ্যে আনার দাবি উঠেছে। মাঠ সংস্কারের যুক্তি কতটা বাস্তবসম্মত এবং গাছের ক্ষতি কতটা অনিবার্য ছিল এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বিতর্কের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ দুটিই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। ফলে বাঘারপাড়া ডিগ্রি কলেজের মাঠ সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং বৃক্ষ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিবেশবিষয়ক গবেষক ও পরিবেশকর্মী আব্দল্লাাহ আল মামুন
www.magpienews24.com Bangla News, Letest News, Jessore News